এমরান হোসেন, জামালপুর প্রতিনিধিঃ জামালপুরের চরাঞ্চলে দূর্গম যোগাযোগ, বন্যা, নদী ভাঙ্গন এবং দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা চরম অবহেলিত ও চ্যালেঞ্জিং। চরের স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট, যাতায়াত সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোমলমতি শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বসতভিটাসহ স্কুলভবন নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অকালে ঝরে পড়ছে বহু শিক্ষার্থী।প্রতি বছরের ন্যায় গত বছরও বন্যার কারণে জেলার ৩৬৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। বহু শিক্ষার্থীর বাড়িঘর বন্যার পানিতে ডুবে যায়। অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় আর স্কুলে ফেরা হয় না শিশুদের।
জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে বিশেষ করে মাদারগঞ্জ উপজেলার পাকরুল, আতামারি ও হিদাগাড়ি চর, ইসলামপুর উপজেলার মন্নিয়া, জিগাতলা, সিন্ধুরতলী, শিলদহ, চর বরুল, চেঙ্গানিয়া, কাসারিডোবা, চর শিশুয়া, সাপধরি, ইনডুলেমারী, কোদালধোয়া, মণ্ডলপাড়া, বরুল, প্রজাপতি, বিশরশি ও বীরনন্দনের পাড়া, সরিষাবাড়ী উপজেলার নলসন্ধ্যা এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার টিনেরচর সহ ব্রহ্মপুত্র নদীর তীর ঘেঁষা চরগুলো অত্যন্ত দুর্গম হয়ে উঠেছে।
জেলা শিক্ষা বিভাগ ও পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রে জানা যায়, যমুনার চরাঞ্চলে ২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫টি মাদ্রাসা, ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। এসব চরাঞ্চলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। স্কুলের পরিবর্তে শিশুদের কর্মস্থলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নাজুক হওয়ার পেছনে রয়েছে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা। নদীর তীরঘেঁষা এসব চরাঞ্চলে রাস্তাঘাট না থাকায় মাইলের পর মাইল শুধু বালুচর। প্রতি বছর নদীভাঙনের ফলে অনেক স্কুল বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি নদীগর্ভে চলে যায়। ফলে পুনরায় নির্মাণ করাসহ স্থানান্তর করতে হয় স্কুলগুলো। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে খরার কবলে পড়তে হয়। তাছাড়া এসব চরাঞ্চলের বেশির ভাগ পরিবার অসচ্ছল। যে কারণে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পড়ানোর চেয়ে খেত-খামারে কাজ করাতেই আগ্রহী হচ্ছে। ফলে এসব চরাঞ্চলের হাজারো শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব শিশু জানেই না তাদের ভবিষ্যৎ কী?
চরের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয়রা জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ শিক্ষক উপজেলা ও জেলা শহরে থাকাই তাঁরা স্কুলে তেমন একটা আসে না। ক্লাস চলে প্রক্সি শিক্ষক ও দপ্তরি দিয়ে। এলাকার অল্পশিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের সামান্য কিছু বেতন দিয়ে এসব বিদ্যালয় কোনোরকমে পরিচালনা করা হচ্ছে। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। যারা বিদ্যালয়ে যায়, তারাও সারা দিন খেলাধুলা আর হইহুল্লোড় করে বাড়ি ফিরে যায়।
জেলার এসব চরাঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার হার ও গুণগতমান নিশ্চিত করতে বিশেষ সরকারি পরিকল্পনা ও টেকসই স্কুল অবকাঠামোর প্রয়োজন। জেলার সচেতন মহল মনে করছেন চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এলাকাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, অস্বচ্ছল পরিবারের বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়মুখী করতে উৎসাহিত করা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তর চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করলে হয়তোবা এসব চরাঞ্চলের কোমলমতি শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

