মোঃমাসুদ রানা,
মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
মুন্সিগঞ্জের প্রতিটি পরিবারে আজও কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করা হয় রেমিট্যান্স, প্রবাসী সন্তানের পাঠানো সেই অর্থ, যা বাড়ির জমির উন্নয়ন, ঋণ পরিশোধ, চিকিৎসা খরচ এবং সন্তানের শিক্ষার খরচ পর্যন্ত জুড়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পরিসংখ্যান ও ব্যাংক ডাটা থেকে পরিষ্কার ইঙ্গিত মিলছে দেশের মতো মুন্সিগঞ্জেও রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারা একঘেঁয়ে নয়, বরং দুই ঘটনাচক্রে বিভক্ত- মূল্যমান ও পরিমাণে ওঠানামা।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্র মিলে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্যের ভিত্তিতে যেখানে রেমিট্যান্স প্রবাহ মোটামুটি বৃদ্ধির পথে, সেখানে ভারতীয় ডাটা ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় কিছু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির দিকে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে মোট রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৪.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসীরা প্রায় ৮,৫৭৩ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭,৪৯৭ মিলিয়ন ডলার।
এটি দেশের অর্থনীতির সাধারণ প্রবণতার স্বস্তিদায়ক দিক, বিশেষত বৈদেশিক মুদ্রার চাপের সময়। মুন্সিগঞ্জের মতো জেলায় গৃহস্থালি অর্থনীতিতে এই প্রবাহ সরাসরি প্রভাব ফেলে ঋণ-ব্যবস্থা, স্থায়ী আয় এবং স্থানীয় ব্যবসার গতিশীলতায়।
কিন্তু এই সার্বিক বৃদ্ধি যে শুধু এবং শুধু নির্ভরযোগ্য নয় তারও যথেষ্ট প্রমাণ আছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্থায়ী স্তর ধরে রাখবে, কিন্তু সেখানে গ্লোবাল কর্মসংস্থান পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে আশংকা থাকায়।
এই তথ্য ইঙ্গিত করে, যদিও রেমিট্যান্সের মোট প্রবাহ স্থিতিশীল বা বাড়ছে, বিদেশে নতুন কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ, আজ রেমিট্যান্স পাচ্ছি, কিন্ত আগামী সপ্তাহ, মাস বা বছরেও কি একই প্রবাহ বজায় থাকবে? এটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মুন্সিগঞ্জের গ্রামগঞ্জে দেখা যায় রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবহৃত হয় কৃষিজমির উন্নয়ন ও সেচ ব্যবস্থা ঠিক করার জন্য ঋণ শোধ, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও কোচিং এর ফি, ছোট ব্যবসা খোলার সূচনা বিনিয়োগ, বাড়ির আধুনিকীকরণ ও চিকিৎসা ব্যয়ের কাজে।
এগুলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে আছে এবং সাধারণত প্রতি মাসে কোনো না কোনো প্রবাসী স্বজন থেকে তারা টাকা পেয়ে থাকে।
কিছু পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেল, তাদের রেমিট্যান্েেসর টাকা খরচ হয়েছে জমি কিনতে, মোবাইল/ইন্টারনেট ঋণ পরিশোধে কিংবা সন্তানদের বিদেশে শিক্ষার ফি সাজাতে।
তবে সব পরিবার সমানভাবে লাভবান নয়। অনেকেই প্রথম কয়েক মাস অর্থ পাচ্ছেন না, আবার অনেকে ঠিক সময়ে পাচ্ছেন না বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টরের কারণে।
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর জোর বাড়ানো হয়েছে। কারণ এটি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বিদেশি মুদ্রার প্রবেশ আরও নির্ভরযোগ্য করে।
বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রেমিট্যান্সের বড় একটা অংশই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানো হয়, ৭৩% এর মতো। কিন্তু অবশিষ্টাংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের (যেমন, হুন্ডি) মাধ্যমে আসে, যা সরকারী পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।
এ বিষয়টি মুন্সিগঞ্জের মতো অঞ্চলে বিশেষ গুরুত্ব পায়, যেখানে অনেক পরিবার ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নয় বা তাদের কাছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুবিধা সহজলভ্য নয়। যদিও অন্য চ্যানেলগুলোতে নির্দিষ্ট টাইম-ট্রানজেকশন কম হতে পারে, সরকারি রেকর্ডে তা মোট রেমিট্যান্স প্রবাহ কম দেখায়।
একটি বড় কাঠামোগত বিষয় হচ্ছে, প্রবাসে নতুন কর্মীর সংখ্যা কমছে। ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২২% হ্রাস পেয়েছে, যা বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যদিও রেমিট্যান্সের মোট পরিমাণ বাড়ছে বা স্থিতিশীল থাকছে, কিন্তু এটি কম সংখ্যক কর্মী থেকে আসে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
রেমিট্যান্স পাঠাতে যেসব খরচ ও ফি পাওয়া যায়, সেগুলোও এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে লক্ষ্য করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রবাসীরা উঁচু ফি দিচ্ছেন, প্রায় ৯.৪% শুল্ক, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
এই অতিরিক্ত খরচ প্রবাসীদের কাছে অকল্যাণকর এবং পরিবারের হাতে আসা নেট আয়কে কমিয়ে দেয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে মুন্সিগঞ্জের মতো অঞ্চলে আর্থিক চাপ অনুভূত হতে পারে।
রেমিট্যান্স শুধু পরিবারই নয়, দেশীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ। এটি দেশের জিডিপির প্রায় ৬-৮% পর্যন্ত অবদান রাখে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত শক্ত করে এবং আমদানি ও ঋণ ব্যবস্থায় সহায়তা করে।
মুন্সিগঞ্জের মতো জেলায় এই অর্থ সরাসরি খুচরা ব্যবসা থেকে শুরু করে স্থায়ী বিনিয়োগে আসতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ চ্যানেলে প্রবাহিত হয়।
সরকার বছরের বিভিন্ন সময়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য নগদ প্রণোদনা দেয়, যেমন এক সময় ২.৫% পর্যন্ত হতে দেখা গেছে।
এছাড়া শ্রমিক কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ঘোষণা করে থাকে যাতে প্রবাসীদের সুবিধা দেওয়া হয়। এতে সাম্প্রতিক ঘোষণা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করলে খরচে লাশ ফেরত আনার ব্যয় আদায় হবে না এমন তথ্যও এসেছে।
এই ধরনের পদক্ষেপ মুন্সিগঞ্জের পরিবারগুলোর মধ্যে আশার আলো জ্বালাতে পারে।
মুন্সিগঞ্জের পরিবারের কাছে রেমিট্যান্স এখন শুধু অর্থ নয়, এটি নিরাপত্তার অনুভূতি, ভরসা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবুও সাম্প্রতিক ডাটা স্পষ্ট করে রেমিট্যান্সের মোট প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানোর হার বৃদ্ধি পেয়েছে, রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা মজুত শক্ত হয়েছে। কিন্তু নতুন শ্রমিক প্রেরণে প্রবাহ কমছে, অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল এখনও বড় অংশ দখল করে, পাঠানোর খরচ বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়ে গেছে।
এজন্য মুন্সিগঞ্জের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের দরকার সম্প্রসারিত কর্মসংস্থান নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, যাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ শুধু সংখ্যায় বাড়ে না, বরং শক্তি হিসেবে আরও স্থায়ী হয়।

