মোঃমাসুদ রানা,
মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত লৌহজং উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠ এখন সবুজ আলু গাছে ছেয়ে গেছে, কৃষক-কৃষাণীরা দিনরাত পরিশ্রম করে ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আলু ঘিরেই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা, তবে ফলন ভালো হওয়ার জোর সম্ভাবনা থাকলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই, কারণ বাজার দরের অনিশ্চয়তা; গত মৌসুমে আলুর দাম ধস নামায় অধিকাংশ কৃষক লোকসানে পড়ে পুঁজি হারিয়েছেন এবং সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আশায় এবারও চড়া দামে সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ কিনে চাষাবাদ করছেন। বর্তমানে আলু ক্ষেতে চলছে নিবিড় পরিচর্যা, কোথাও পানি সেচ, কোথাও আগাছা পরিষ্কার, আবার কোথাও রোগবালাই দমনে নিয়মিত ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে, উত্তরবঙ্গের রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নারী-পুরুষ শ্রমিকরা এ কর্মযজ্ঞে অংশ নিচ্ছেন এবং চলতি মাসের শেষের দিকে আলু উত্তোলন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩ হাজার ১০৯ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে; কৃষকদের হিসাবে প্রতি কানি (১৪০ শতাংশ) জমিতে আলু চাষে খরচ পড়েছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যার মধ্যে জমির ভাড়া ৭০ হাজার, বীজ আলু ৪৫ হাজার, সার ৩০ হাজার, জমি চাষ ১৫ হাজার, রোপণ শ্রমিক ৩০ হাজার, উত্তোলন ব্যয় ২০ হাজার এবং সেচ, কীটনাশক ও নিড়ানি ৩০ হাজার টাকা, এই হিসাবে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ দাঁড়াচ্ছে ১৫ টাকা ৬২ পয়সা এবং এক কানি জমি থেকে গড়ে ৪০০ মণ বা প্রায় ১৬ মেট্রিক টন (১৬ হাজার কেজি) আলু উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা। বর্তমানে বাজারে নতুন আলু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে, ফলে উৎপাদন খরচ ওঠানো নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা, অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন; হাড়িদিয়া গ্রামের কৃষক কার্তিক দাস জানান, গত বছর ১৫ একর জমিতে আলু আবাদ করে উৎপাদন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে কেজিপ্রতি খরচ হয়েছিল ২৬ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৮ টাকায়, ভয়াবহ লোকসানের পরও চলতি মৌসুমে ১০ একর জমিতে চাষ করেছেন তিনি এবং বাজারমূল্য নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় আছেন; কৃষক জসীম শেখ বলেন, কারেন্ট পোকার আক্রমণে অনেক জমিতে গাছ পচে যাচ্ছে এবং ওষুধ প্রয়োগ করেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে আলু চাষিদের রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যেমন সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু ক্রয়ের ব্যবস্থা, উদ্বৃত্ত আলু রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি, কোল্ড স্টোরেজে নজরদারি জোরদার এবং পাইকারি বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে কঠোর মনিটরিং; উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হাসান উদ দৌলা জানান, বর্তমানে রোদের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকায় গাছের লালচে ভাব কমে আসছে এবং প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে এ বছর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে, এখন দেখার বিষয় বাজার মূল্য কৃষকদের মুখে হাসি ফেরাতে পারে কি না।

