5169
Loading ...

সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ

মোঃমাসুদ রানা,
মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:

রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা উঠান বৈঠক এসব এখন আর রাজনীতির একমাত্র মঞ্চ নয়। স্মার্টফোনের ক্যামেরা অন হলেই শুরু হয়ে যায় নতুন লড়াই। ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ভিডিও, ভাইরাল পোস্ট সবমিলিয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মুন্সিগঞ্জের মতো জেলা শহরেও এই পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান। প্রশ্ন উঠছে, রাজনীতির কেন্দ্র কি এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরে যাচ্ছে?
ডিজিটাল গ্লোবাল রিপোর্ট- ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটির বেশি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ৫ কোটিরও বেশি।
মেটা প্লাটফর্ম এর বিজ্ঞাপন সরঞ্জামভিত্তিক ডাটা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেইসবুক ব্যবহারকারী কয়েক কোটির ঘরে, যা দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম বড় বাজারে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ ১২ কোটিরও বেশি।
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডিজিটাল মাধ্যম এখন শক্তিশালী হাতিয়ার।
২০১৮, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ডিজিটাল প্রচারণা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এ তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিবেদনে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের একাধিক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, নির্বাচনী প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে এবং এর সঙ্গে অনলাইন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮) প্রয়োগের প্রসঙ্গে বলেছে, অনলাইন রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে আইনগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতারা এখন দলীয় কার্যালয়ে বসেই ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেন। এর সুবিধা তাৎক্ষণিক দর্শক সংযোগ, মন্তব্যের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া, দ্রুত শেয়ার হয়ে ভাইরাল হওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেসবুক লাইভ রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোর খরচ কমিয়ে দিয়েছে। যেখানে আগে সভা আয়োজন করতে বড় লজিস্টিক প্রয়োজন হতো, এখন একটি স্মার্টফোনই যথেষ্ট।
মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরেও স্থানীয় নেতাদের লাইভ বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া নিয়মিত দেখা যায়, যদিও এ বিষয়ে আলাদা সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে জাতীয় প্রবণতা অনুযায়ী জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক ডিজিটাল সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিজিটাল রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গুজব ও অপপ্রচার।
রিউমার স্ক্যানার এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৬ সময়ে রাজনৈতিক ইস্যু ঘিরে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা বেড়েছে।
এছাড়া ফ্যাক্টওয়াচ জানিয়েছে, নির্বাচনী সময়ে গুজবের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার, এডিট করা ভিডিও, পুরোনো ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮) পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপান্তরিত হয়। এই আইনের অধীনে অনলাইন মানহানি, রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা ও গুজব ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতায় রাজনীতিবিদ ও সাধারণ ব্যবহারকারী দু’পক্ষই এক ধরনের সতর্ক পরিবেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছেন।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তরুণ ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। প্রথমবারের ভোটারদের বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নীতি-আলোচনায় অংশগ্রহণ, সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
তবে একইসঙ্গে ‘ইকো চেম্বার’ বা মতাদর্শগত বিভাজনও বাড়ছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের মতের সঙ্গে মিল আছে এমন কনটেন্টই বেশি দেখেন।
মুন্সিগঞ্জ ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় জেলা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারাও এখন ফেসবুক পেইজ পরিচালনা করেন। ফলে সভা না করেও লাইভের মাধ্যমে সমর্থক সমাবেশ হয়, অনলাইন সমালোচনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সংখ্যাগত ডেটা সরকারি প্রকাশনায় নেই, যা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল প্রচারণা রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের নতুন বাজার তৈরি করেছে।
মেটা প্লাটফর্ম এর এড লাইব্রেরিতে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের তথ্য উন্মুক্ত থাকে। সেখানে দেখা যায় বাংলাদেশ থেকেও রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুভিত্তিক বিজ্ঞাপন প্রচার হয়।
যদিও জেলা-ভিত্তিক ব্যয়ের তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশিত নয়, জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ডিজিটাল ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এমন ইঙ্গিত বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ- তথ্য যাচাই ব্যবস্থার উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরি।
বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ দমন জোরদার করেছে। একইসঙ্গে নাগরিক সমাজ ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
মুন্সিগঞ্জে কিংবা সারাদেশে রাজনীতির মঞ্চ এখন আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। স্মার্টফোনের পর্দায়ও ক্ষমতার লড়াই চলছে।
সোশ্যাল মিডিয়া রাজনীতি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, আবার একইসঙ্গে বিভ্রান্তি ও বিভাজনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
ডিজিটাল রাজনীতির এই নতুন বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও তথ্যের সত্যতা কতটুকু নিশ্চিত করা যাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *