হুন্ডি, অনলাইন বেটিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের ছায়া বাস্তবতা মুন্সিগঞ্জে অদৃশ্য অর্থনীতির হাঁকডাক
মোঃমাসুদ রানা,
মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
দেশের অর্থনীতি দৃশ্যমান খাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এর পাশাপাশি সমান্তরালভাবে বেড়ে উঠছে এক অদৃশ্য অর্থনীতি। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন, অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মে কোটি টাকার বাজি এবং একই সঙ্গে বৈধ ডিজিটাল আয়ের উৎস হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং সবমিলিয়ে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের মতো প্রবাসী-নির্ভর ও তরুণ অধ্যুষিত জেলায় এর প্রভাবও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৩.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে একই সময়ে বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উঠে এসেছে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে না।
এ ব্যাপারে কী বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক? বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার সতর্ক করেছে যে, হুন্ডি কার্যক্রম রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন এলাকায় হুন্ডি চক্রের সদস্য গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় দৈনিকগুলোতে।
হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ফলে সরকার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হারায়, অর্থপাচারের ঝুঁকি বাড়ে, সন্ত্রাসী অর্থায়নের আশঙ্কা তৈরি হয়।
মুন্সিগঞ্জ জেলায় প্রবাসী পরিবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া প্রবাসী)। স্থানীয় ব্যাংকারদের মতে, বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছু সময়ে ওঠানামা করে, যা জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া বা বেটিং আইনত নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০২২ু২০২৪ সময়ে শতাধিক অবৈধ জুয়া ও বেটিং ওয়েবসাইট ব্লক করার কথা জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার ক্রাইম ইউনিট নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে- তরুণদের একটি অংশ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বেটিং করছে, বিকাশ/নগদ/ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের চেষ্টা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রমোশনাল লিংক ছড়ানো।
মুন্সিগঞ্জে সরাসরি কত টাকার লেনদেন হচ্ছে এমন সুনির্দিষ্ট ডাটা সরকারি প্রকাশনায় নেই। তবে জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অনলাইন প্রতারণা ও জুয়া-সংক্রান্ত অভিযোগ গত কয়েক বছরে বেড়েছে, যা জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে ডিজিটাল অর্থনীতির ইতিবাচক দিকও রয়েছে।
আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশে প্রায় ৬-৭ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছে এবং আইটি-ভিত্তিক সেবাখাত থেকে বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে।
বিশ্ব ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে (যেমন, আপওয়ার্ক, ফাইভার ইত্যাদি) বাংলাদেশি তরুণদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
মুন্সিগঞ্জের কয়েকটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে আয় করছেন। যদিও জেলা-ভিত্তিক আয় সংক্রান্ত সরকারি আলাদা পরিসংখ্যান নেই, জাতীয় প্রবণতা অনুযায়ী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে ডিজিটাল আয়ের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
এই তিনটি প্রবাহ হুন্ডি, অনলাইন বেটিং ও ফ্রিল্যান্সিং একটি জটিল দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যার মূল কারণ তিনটি- দ্রুত ও কম খরচে অর্থ পাঠানোর চাহিদা, তরুণদের উচ্চ আয়ের আকাঙ্ক্ষা, ডিজিটাল লেনদেনে পর্যাপ্ত আর্থিক সচেতনতার অভাব।
বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (২০১২ সংশোধিত) অনুযায়ী অবৈধ অর্থ লেনদেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করে।
একইভাবে, তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও দণ্ডবিধির আওতায় অনলাইন জুয়া অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
মুন্সিগঞ্জের অর্থনীতি প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিনির্ভর। ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু যদি অবৈধ অর্থপ্রবাহ বাড়ে, তাহলে ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, স্থানীয় বাজারে কালো টাকার প্রভাব বাড়বে, সামাজিক অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এখান থেকে সমাধানের পথ বিশেষজ্ঞদের মতে- বৈধ রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেনে আর্থিক সচেতনতা, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহজ ব্যাংকিং সুবিধা, অবৈধ বেটিং সাইট দ্রুত ব্লক।
সরকার ইতোমধ্যে রেমিট্যান্সে ২.৫% প্রণোদনা দিয়েছে, যা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে।
অদৃশ্য অর্থনীতি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়, এর একটি অংশ বৈধ ডিজিটাল আয়। কিন্তু অবৈধ চ্যানেলগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মুন্সিগঞ্জের মতো জেলায় সচেতনতা, নজরদারি ও বৈধ আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি- এই তিনটি ভারসাম্যই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চাবিকাঠি।

