জামাল হোসেন তারেক, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)
পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি পাকা সড়ক। সড়কটি নির্মাণ শুরু হওয়ায় অবহেলিত জনপদের মানুষের মুখে ফুটেছিল আনন্দের হাসি। কিন্তু সেই আনন্দ এখন রূপ নিয়েছে তীব্র যন্ত্রণায়।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের ‘পাঁচপীর ঝালাই সড়ক’ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এই উন্নয়ন কাজ এখন এলাকাবাসীর জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পিচ ঢালাই হাত দিলেই উঠে যাচ্ছে এবং অনেক স্থানে ইতিমধ্যে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের দুই পাশে সুরক্ষার জন্য যে ইটের ‘এজিং’ বা গাইড ওয়াল দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত নড়বড়ে। যেকোনো সময় তা ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“পাহাড়ি এলাকায় আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা এমনিতেই খুব দুর্বল। নতুন রাস্তা দেখে আমরা আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু ঠিকাদারের গাফিলতি আর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে উদ্বোধনের আগেই রাস্তাটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘কনকর্ড এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের অসুস্থতার কথা জানান। কাজের ধীরগতির সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকা ও ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে কাজে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে তিনি ইতিমধ্যে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন বলেও দাবি করেন। তবে কাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, তিনি শতভাগ মানসম্মত কাজই করছেন।
এদিকে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি খোদ সরকারি কর্মকর্তার পরিদর্শনকালেই প্রমাণিত হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী প্রীতম সিকদার জয় জানান, তিনি নিজে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে এলাকাবাসীর অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“কাজে ত্রুটি পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা সুধরে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর তা ল্যাব টেস্ট ও যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ বুঝিয়ে নেওয়া হবে না এবং ত্রুটি থাকলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত বিল আটকে দেওয়া হবে।”
উন্নয়নের নামে এমন ‘নড়বড়ে’ কাজ সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। পাহাড়ি অঞ্চলের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু বিল আটকে রাখাই নয়, বরং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টেকসই ও মানসম্মত সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করা হোক। স্বপ্নের সড়কটি যেন কোনোভাবেই জনদুর্ভোগের স্থায়ী কারণ হয়ে না দাঁড়ায়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন এটাই কুলাউড়াবাসীর আকুল আবেদন।

