এমরান হোসেন, জামালপুর প্রতিনিধিঃ জামালপুর জেলার অধিকাংশ এলাকা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল। ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে ঘরবাড়িসহ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয় হাজারো মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জমিজমা সহ বসতভিটা হারিয়ে মাথা ঘোঁজার ঠাঁই এবং কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও নদীর তীরের এসব মানুষ স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সুবিধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। নদীর করাল গ্রাসে বসতভিটা ও অধিকাংশ স্কুলভবন ক্ষতিগ্রস্ত এবং নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অকালেই ঝরে পড়ছে বহু কোমলমতি শিক্ষার্থী। সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবে জামালপুরে উন্নয়নের ছোঁয়াও সেভাবে লাগে না। যুগের পর যুগ এ অঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেই যাচ্ছেন।
জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঝিনাই, দশানী, জিঞ্জিরাম, আলাই ও মরা জিঞ্জিরাম নদ–নদী। নদীর কারণে জেলায় রয়েছে অসংখ্য চর। দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ ও জামালপুর সদরের কিছু অংশসহ সাতটি উপজেলাতেই প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। বন্যায় যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবেষ্টিত এলাকার লক্ষাধিক মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় থাকেন। অন্যদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের বন্যায় সাতটি উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৬টিই প্লাবিত হয়। একি সাথে ৮টি পৌরসভার মধ্যে চারটি বন্যাকবলিত হয়। মোট ৪৯০টি গ্রামের ৫ লাখ ৯৮ হাজার ২১৭ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিল। ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ২৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৫ হাজার ৪৯২ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছিল, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
কয়েক যুগে ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ি ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার নদীতীরের ১৫টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামের ফসলি জমি ও ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে প্রায় ২০ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে চলে গেছে প্রাচীন বাজার, রাস্তাঘাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
নদীভাঙনের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে প্রচন্ড খরার প্রকোপে পড়তে নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের। মৌলিক নাগরিক অধিকারের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত মানুষ। যোগাযোগ ব্যবস্থা অতন্ত্য ভঙ্গুর। তাদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা একপ্রকার দুর্লভ বিষয়। এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত নানা রোগব্যাধির সম্মুখীন হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব হলে জামালপুরের নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের সম্ভবনা রয়েছে।

