5169
Loading ...

বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন: স্বস্তি খুঁজছে ক্রেতা

মোঃমাসুদ রানা,
মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:

পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার পর থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা বাজারে দাম ওঠানামা, প্রশাসনিক অভিযান, ক্রেতা-ব্যবসায়ীর প্রতিক্রিয়া এসব নিয়ে গত কয়েকদিনে জেলা ভরেই উত্তেজনা তীব্রভাবে বিরাজ করছে। বিশেষ করে মুদি দোকানে সয়াবিন তেল অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে জরিমানা, রমজান উপলক্ষে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম চালানো, ফল ও অন্যান্য দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ সবাই ই আলোচিত হয়ে উঠেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সদরের বড় বাজার এলাকায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি দল বাজার মনিটরিং কার্যক্রম চালান এবং বোতলজাত সয়াবিন তেল নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অপেক্ষা বেশি দামে বিক্রির দায়ে এক মুদি দোকানিকে ৫০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানের সময় মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয় রসিদ যাচাইসহ বিভিন্ন দিক নজর দেওয়া হয়। এমন কঠোর পদক্ষেপ মূলত স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়ার প্রবণতা রোধ করতে নেওয়া হয়েছে।
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসিফ আল আজাদ জানান, ‘ভোক্তা অধিকার ও বাজার ব্যবস্থার স্বার্থে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে এ মনিটরিং কার্যক্রম ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, তবে রয়েছে কিছু প্রশ্নও।
একইসাথে, বিস্তৃত বাজার পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে স্থানীয় প্রশাসন অতিরিক্ত দাম, অনিয়ম, ভেজাল ও মূল্য তালিকা না প্রদর্শন এসব বিষয় নিয়েও নজরদারি করছে। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজার মনিটরিং অভিযানে ফলের দোকানগুলোয় বাধ্যতামূলকভাবে মূল্য তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখা হয়েছে এবং তরমুজসহ ফলগুলোর দাম ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তা অধিকারের ব্যক্তিদের বক্তব্য, ‘ক্রেতা যাতে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত বাজারদর পান এবং যাতে কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট অভিযান চলমান রাখা হবে।’ তবে এমন কার্যক্রম নিয়েও কিছু ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘মূল্য তালিকা লাগালে ভালো, কিন্তু পাইকারি থেকে খুচরায় দাম ওঠানামা কমাতে শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়।’
এদিকে রাজধানীর বাজারে চলতি রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। এমন তথ্য ডেইলি স্টার এর খোঁজে পাওয়া গেছে। যেমন- লেবু, শসা, সবজিসহ কিছু খামারি পণ্যের দাম পূর্বের তুলনায় নেমে এসেছে। বিশেষ করে লেবু এখন কিছু বাজারে পূর্বের তুলনায় কমে ১ হালি ৩০-৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
দেশের সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি গত কয়েক মাসে সবজি, ফল ও কিছু দ্রব্যের ক্ষেত্রে চড়া থাকায় ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে এমন রিপোর্টও বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন খুচরা বাজারে সবজির দাম প্রায় ৬০ু৮০ টাকার মতো বা তারও বেশি থাকায় মধ্য ও নিম্নআয়ের ক্রেতারা বাজেটের সঙ্গে তাল মিলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
মুন্সিগঞ্জের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা বিভিন্নভাবে বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন। একজন মুদি দোকানি বলেন, ‘রমজানের সময়ে ক্রেতার চাহিদা বাড়লে কিছু পণ্যের দাম সাময়িকভাবে ওঠে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত দামে বিক্রির জন্য কেউ কেউ সুযোগ নিতে পারে, তাই বাজার মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ।’
অন্যদিকে, একজন গৃহিণী বলেন, ‘আমাদের পরিবারের বাজেট সীমিত। রমজান শুরু হতেই নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একটু বেশি, এটা সত্যিই ভোগান্তিকর।’
সরকারি সূত্র জানায় যে রমজান মাসে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান চলবে। বিভিন্ন মহলে মনে করা হচ্ছে, শুধু একটি বা দুটো অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও জরিমানা কার্যক্রম থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য হবে।
অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র মনিটরিং যথেষ্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায় সমন্বয় এসবই বাজারকে স্থিতিশীল রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রমজানের মধ্যে বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং ক্রেতাদের উপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত কেন্দ্রীকৃত বাজার তথ্য প্রকাশ ও মূল্য তালিকা নিয়মিত আপডেট রাখা, টিসিবির মতো সংস্থার মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যের পণ্য সরবরাহ বাড়ানো, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি-ভিত্তিক পণ্য বিতরণ কর্মসূচি কার্যকর করা, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে মূল্য ওঠানামা কমাতে সমন্বিত নীতি প্রণয়ন।
এসব রমজান মাসের অগ্রগতির ওপর গুরুত্বারোপ করে এক কৃষি বিশ্লেষক বলেন, ‘যদিও কিছু পণ্যের দাম সাময়িকভাবে কমতে শুরু করেছে, তবুও বাজারে ওঠানামা ও সংকট রোধে পরিকল্পিত পদক্ষেপ জরুরী।’
রমজানের পরিমন্ডলে মুন্সিগঞ্জসহ সমগ্র দেশের খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় বাজারে চাপ থাকা স্বাভাবিক। তবে প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সমন্বয় আর নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব। যারা বাজার নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল, তাদের প্রয়াস কতটুকু বাস্তবে প্রভাব ফেলবে, তা সামনের দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *