5169
Loading ...

শিক্ষক সংকটে ভুগছে গোবিপ্রবি, নিয়োগে অনীহা ইউজিসির!

আরমান মজুমদার, গোবিপ্রবি প্রতিনিধি

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) বিভিন্ন বিভাগে তীব্র শিক্ষক সংকট, কিন্তু নিয়োগে অনীহা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি)। গণমাধ্যমে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে একটি সংবাদ প্রকাশ হয় গত বছরের ২৯ নভেম্বর। এরপর একটি চিঠির মাধ্যমে ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায় ইউজিসি এবং কয়েকটি প্রশ্ন করে লিখিত জবাব চায়। ইউজিসির চিঠির পরদিন নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া ৮টি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ডিনদের নিয়ে লিখিত জবাবসহ ইউজিসিতে হাজির হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গোবিপ্রবির নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া বিভাগগুলোর বিভাগীয় প্রধান, ডিন, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এর দায়িত্বে থাকা সদস্য তানজিম উদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করে দাবি করেন, নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি। এরপর আড়াই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে কি না সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ইউজিসি ফলে বন্ধ রয়েছে নিয়োগ কার্যক্রম। এদিকে নিয়োগ বন্ধ থাকায় রাগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকার পেছনে ইউজিসির উদাসীনতাই দায়ী। তারা মনে করেন, শিক্ষক সংকটে জর্জরিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা ইউজিসির সদিচ্ছার অভাব। নিয়োগে অনিয়ম থাকলে তা এতদিনে শনাক্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতো ইউজিসি। পাশাপাশি নিয়োগ কার্যক্রম ও স্বাভাবিক করা যেত।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউজিসি এ পর্যন্ত ২টি চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। প্রথম চিঠিতে ২ ডিসেম্বর নিয়োগ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায় এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ- পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য চাপ প্রয়োগ, বোর্ড সম্পন্ন হওয়ার আগেই রেজল্যুশনে স্বাক্ষর গ্রহণ, আর্থিক অনিয়ম, কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী মনোনয়ন, লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের বিধান থাকলেও তা বাতিল করে একাডেমিক ফলাফল, প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বিধান করাসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়-এ লিখিত জবাব জানতে চাওয়া হয়, যা পরদিন ই পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ১৯ জানুয়ারি পুনরায় ইউজিসি আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে জানতে চায়, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা না নেওয়ার কারণ, নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সম্মানিত সদস্যদের নামের তালিকা, প্রার্থীদের একাডেমিক ফলাফল, প্রেজেন্টেশন ও ভাইভাসহ পরীক্ষায় প্রাপ্ত মোট নম্বর, বাছাই বোর্ডের সকল সদস্যের স্বাক্ষর সম্বলিত সুপারিশের অনুলিপি, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত। চিঠি প্রাপ্তির পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার জবাব পাঠানো হয়।

ইউজিসি সূত্রে জানা যায়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি গোবিপ্রবির নিয়োগ কার্যক্রম উত্তাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি কমিটি করে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে ইউজিসি। কিন্তু এই কমিটির কোনো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কয়েকদিন পর একই তারিখে আহ্বায়ক পরিবর্তন করে পুনরায় আরেকটা চিঠি করে ইউজিসি।

এদিকে ইউজিসির চিঠির আলোকে গত ১৮ ই ফেব্রুয়ারি ৭ কর্মদিবস শেষ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখার পেছনে ইউজিসির উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন গোবিপ্রবির শিক্ষক শিক্ষার্থীর। তারা বলছেন ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টানাপড়েনের ফলে ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যেখানে ইউজিসিতে বারবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, কয়েকটি বিভাগে মাত্র ১ জন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, সেখানে এত দীর্ঘ সময় নিয়োগ বন্ধ রাখা ইউজিসির উদাসীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। নিয়োগসংক্রান্ত কাজে কোনো অনিয়ম-এর প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে অনতিবিলম্বে নিয়োগ কার্যক্রম চালু করতে হবে। দিনের পর দিন এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখা সমীচীন নয়।

কেন ২ মাস ৩ দিন পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো এবং সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি এমন প্রশ্নের জবাবে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান বলেন, তদন্ত তো চলছে, তদন্ত তো খুব সহজ তদন্ত না। আর আমরা যে কমিটি প্রথমে করেছিলাম সে আহ্বায়ক ও পরিবর্তন করতে হয়েছে, সেহেতু কাজ যথাযথভাবে শুরু করতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট অনেকদিন ধরে, এটা তো হঠাৎ করে হয়নি। এখানে শিক্ষক ছাড়াই বিভাগ খুলে ফেলা হয়েছে, একদম অপরিকল্পিতভাবে বিভাগ খোলা হয়েছে।
মুশকিলটা হচ্ছে, যে অভিযোগ গুলো আসছে সেগুলো খুব সিরিয়াস অভিযোগ। পার্টিকুলারলি টাকা- পয়সার ডিলিং। এখন এগুলো সুরাহা না করে এই নিয়োগে আমরা আপত্তি না দিই তাহলে আমরাই তো প্রশ্নবিদ্ধ হবো। যেহেতু অভিযোগ আসছে, লিখিত অভিযোগ আসছে, পত্রিকায় লেখা আসছে। আমরা কাজটি ক্লিন ভাবে করতে চাই। আমাদের কমিটি অলরেডি কাজ শুরু করেছে। আমরা তাদের কাছে কাগজ পত্র চেয়েছিলাম কিন্তু তারা দিতে দেরি করেছে। কাগজপত্রগুলো আমরা দেখেছি এবং তদন্ত কমিটির কাছে দিয়েছি। তারা যাচাই-বাছাই করছেন। প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিবেন যারা অভিযোগ করেছেন। এই নিয়োগের অভিযোগগুলো সুরাহা না করে আরেকটি নিয়োগের অনুমোদন দেয়া ঠিক হবেনা। প্রয়োজনে যে অভিযোগ গুলার সত্যতা পাওয়া যাবে পরে এগুলো আবার পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে গোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দীন শেখর বলেন,
এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি, কেবলমাত্র সুপারিশ করা হয়েছে। এরপর রিজেন্ট বোর্ড-এ বিষয়টি উপস্থাপন হবে, যেখান থেকে যে কেউ বাদ পড়তেও পারেন। নিয়োগের এই পর্যায়ে আর্থিক লেনদেনের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে আর্থিক লেনদেন কীভাবে হবে? তাছাড়া বোর্ডে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ সদস্যরা নিজ নিজ মার্কসিট-এ স্বাক্ষর করেছেন, উপস্থিতি পত্র ও ফলাফল সিটে স্বাক্ষর করেছেন। নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে এখন পর্যন্ত নিয়োগে উপস্থিত কোনো বিশেষজ্ঞ সদস্যের একটি আপত্তিও (নোট অব ডিসেন্ট) পাইনি। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। এমনকি ইউজিসিও কোনো লিখিত অভিযোগ-এর কপি পাঠায়নি। এই নিয়োগ বন্ধ রাখতে ইউজিসি নয়, ইউজিসির একজন সদস্যের ব্যক্তিগত আক্রোশ এর ফল। ইউজিসির একজন সদস্য বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন, তিনি ভালো বলতে পারবেন এই বোর্ড কতটা স্বচ্ছ হয়েছে, না হলে তিনি আপত্তি জানিয়ে যেতেন।
দেখুন, এক বা ২টা বোর্ড সম্পর্কে কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়েছে বলে শুনেছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে যে বোর্ডগুলো নিয়ে অভিযোগ নেই, সেগুলো আটকে রাখা হয়েছে কেন? আমরা শতভাগ ফেয়ার বলে ইউজিসির চিঠি প্রাপ্তির পর সব বোর্ড স্থগিত রেখেছি। ইউজিসি আমাদের বোর্ড বন্ধের নির্দেশ নয়, কেবল অনুরোধ জানিয়েছিল। একই চিঠি উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১০০-এর বেশি নিয়োগ দিয়েছে। ইউজিসির যেকোনো চিঠি প্রাপ্তির ২৪ ঘন্টার মধ্যে জবাব পাঠানো হয়েছে, ফলে এখানে বিলম্বের যে অভিযোগ সেটাও মিথ্যা।

এদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগেই সেই অনুপাতে শিক্ষক নেই। এতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে গুণগত শিক্ষা থেকে, তৈরি হয়েছে ভয়াবহ সেশনজটের শঙ্কা।  
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৫০০ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০৪ জন শিক্ষক। এদের মধ্যে আবার অধিকাংশ আছেন শিক্ষাছুটিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *