গৌরব সাহা, নরসিংদী প্রতিনিধি
নরসিংদীর বেলাব উপজেলার জহুরিয়াকান্দা গ্রাম। একসময় সবুজ ধানের ক্ষেত, পাখির ডাক আর ভোরের কুয়াশায় মোড়া শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল এলাকাটি। তবে গত এক যুগে দৃশ্যপট বদলে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, “ইলহাম ব্রিকস ফিল্ড” নামের একটি ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও মাটি কাটার কারণে জনস্বাস্থ্য ও কৃষিজমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভোর থেকে শুরু হয় চিমনির ঘন কালো ধোঁয়া। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পোড়া মাটির গন্ধ। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি ও ঠান্ডাজনিত রোগ বেড়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখলেও ধুলা ঢুকে পড়ে এবং কাপড়ে কালচে আস্তরণ জমে।
কৃষক স্বপন মিয়াসহ কয়েকজন জানান, ভাটার ধোঁয়া ও ছাই ফসলের ক্ষতি করছে। ধানের শীষ ঠিকমতো পূর্ণ হচ্ছে না, ফলন কমছে। অভিযোগ রয়েছে, ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে ভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিস্তৃত এলাকায় প্রভাব
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সল্লাবাদ ইউনিয়নের সররাবাদ ও ইব্রাহীমপুর গ্রামে অন্তত ১১টি ইটভাটা সচল রয়েছে। এছাড়া পাটুলী, আমলাব ও বাজনাব ইউনিয়নেও একাধিক ভাটা রয়েছে। অনেক ভাটার কাগজপত্রে অসঙ্গতি আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দূষণের প্রভাব পড়ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
‘বার্ষিক চুক্তি’র অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভাটা মালিক অভিযোগ করেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বছরে প্রায় তিন লাখ টাকার একটি ‘চুক্তি’ করতে হয়। টাকা না দিলে মোবাইল কোর্টের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মসূচিতে সহযোগিতার চাপও থাকে বলে দাবি করেন তারা। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আইন কী বলছে
বাংলাদেশের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী আবাসিক এলাকা ও ফসলি জমির নিকটে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ভাটা পরিচালনা দণ্ডনীয় অপরাধ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ভাটার বৈধ অনুমোদন নেই।
মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
ইলহাম ব্রিকস ফিল্ডের পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কাগজ দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
পরিবেশ অধিদপ্তর নরসিংদীর উপপরিচালক বদরুল হুদা বলেন, “অনুমোদন ছাড়া ভাটা পরিচালনা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাফছা নাদিয়া বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। বৈধতা না থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রশ্ন রয়ে গেছে
দীর্ঘদিন ধরে একটি ভাটা অবৈধভাবে পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায় ছিল—এ প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, শিল্পায়ন প্রয়োজন হলেও তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির বিনিময়ে হতে পারে না।
জহুরিয়াকান্দার আকাশে এখনো ভাসছে কালো ধোঁয়া। সমাধান মিলবে কবে—সেই অপেক্ষায় এলাকাবাসী।

