জামাল হোসেন তারেক, কুলউড়া ( মৌলভীবাজার)
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় চা-বাগান এলাকায় বসবাসরত কিশোর-কিশোরীদের মানসম্মত শিক্ষা, অধিকার ও সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুইদিনব্যাপী সমন্বয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি কুলাউড়া এগ্রিকালচার ইনস্টিটিউটের হল রুমে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
কর্মশালাটি এফআইভিডিবি (ফ্রেন্ডস ইন ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ)-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহায়তাকারী সংস্থা মালালা ফান্ডের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল চা-বাগান এলাকায় বসবাসরত কিশোর-কিশোরীদের বিদ্যালয়ে টিকিয়ে রাখা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কমানো, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা।
কর্মশালায় অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুলাউড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও একাডেমি সুপারভাইজার মোঃ শফিকুল ইসলাম, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার মনির হোসাইন,উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সৌমিত্র কর্মকার উপজেলা সমাজসেবা অফিসার প্রাণেশ চন্দ্র বার্মা, , উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসাইন, কর্মধা ও রাউৎগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহীন আহমদ চৌধুরী এবং সদর ইউনিয়নের হিসাব সহকারী শৈবাল ভৌমিক।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কুলাউড়া, জুড়ি ও বড়লেখা অঞ্চলের প্রজেক্ট অফিসার সত্য নারায়ণ নাইডু এবং উপজেলা সুপারভাইজার মাহমুদ হোসাইনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করেন দিলদারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রোকসানা বেগম এবং শাহ সুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আছিয়া খাতুন।
দুইদিনব্যাপী কর্মশালায় অংশ নেন মুরইছড়া, গাজিপুর, মেরিনা ও ক্লিভডন চা বাগানের কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা। কর্মশালার প্রথম দিন চারটি চা-বাগানের কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। তারা তাদের বিদ্যালয় জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, আর্থিক সংকটজনিত ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহের ঝুঁকি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সচেতনতার অভাব, নিরাপদ বিদ্যালয় পরিবেশ এবং মেয়েদের পড়াশোনায় পারিবারিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা।
কিশোর-কিশোরীরা দুইটি দলে বিভক্ত হয়ে দুইজন অতিথির সামনে তাদের মতামত, দাবি ও প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তারা বিদ্যালয় ও ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, শিক্ষার প্রতি অনীহা, পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সুস্থতা ও নিরাপদ বিদ্যালয় পরিবেশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন পরামর্শ দেয়। অংশগ্রহণকারী কিশোর-কিশোরীরা প্রশ্নোত্তর ও প্রস্তাব দেয়াল লিখনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। এটি কর্মশালার একটি অংশগ্রহণমূলক ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসিত হয়।
দ্বিতীয় দিনে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন দিলদারপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও শাহ সুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের কিশোর কিশোরী ক্লাবের শিক্ষার্থীরা। তারা স্কুল জীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, পড়াশোনায় বাধা, অনিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষকের মনোভাব, পরিবারিক সহায়তা এবং নিরাপদ বিদ্যালয় পরিবেশের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীরা নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মতামত শেয়ার করে, যার মাধ্যমে কর্মশালা আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী হয়ে উঠে।
অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, চা-বাগান এলাকার কিশোর-কিশোরীরা এখনো শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এফআইডিবিডির তত্ত্বাবধানে এবং মালালা ফান্ডের সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্প কিশোর-কিশোরীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, নেতৃত্ব বিকাশ এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিতভাবে চালু রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন মডিউল, গেম ও দলগত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা নিজেরা ছোট দল তৈরি করে আলোচনা করেন এবং স্কুলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে কীভাবে উন্নয়ন আনা যায় তা প্রস্তাব করেন। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা এবং স্কুলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
এই কর্মশালার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা কিশোর-কিশোরীদের সমস্যা সরাসরি শোনার সুযোগ পান। তারা বিদ্যালয় ও ক্লাবের কার্যক্রমে কীভাবে সহায়তা প্রদান করা যায় তা বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতে বিদ্যালয় ও ক্লাব কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
দুইদিনব্যাপী এই কর্মশালাটি কিশোর-কিশোরী, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, মতবিনিময় ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম দিন চারটি চা-বাগানের কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা অংশ নেন, এবং দ্বিতীয় দিন দিলদারপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও শাহ সুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশগ্রহণ করে। কর্মশালার মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের দক্ষতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

