5169
Loading ...

ফেসবুক মনিটাইজেশন: আয়ের উৎস নাকি ব্যক্তিত্বের অবক্ষয়

মো: পারভেজ হাসান সায়েম
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

বিশ্বগ্রামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন আয়ের সুযোগ। ফেসবুক মনিটাইজেশন, ভিডিওতে বিজ্ঞাপন, স্টারস কিংবা সাবস্ক্রিপশন এসব সুবিধার মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা পেয়েছে সহজেই অর্থ উপার্জনের পথ। তবে এই সহজ আয়ের আকাঙ্ক্ষাই অনেককে ঠেলে দিচ্ছে ফেসবুক মনিটাইজেশন আসক্তিতে। যেখানে ব্যক্তিত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

ফেসবুকের অ্যালগরিদম কন্টেন্টের ভিউ, লাইক ও শেয়ারের ওপর ভিত্তি করে কনটেন্টকে মূল্যায়ন করে। ফলে ক্রিয়েটররা দর্শককে তাদের কন্টেন্টের প্রতি আগ্রহী করতে ক্রমাগত নতুন কনটেন্ট তৈরি ও ভাইরাল হওয়ার কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এতে বাস্তব জীবনের আত্মপরিচয় বদলে গিয়ে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম বা অভিনয়নির্ভর ব্যক্তিত্ব।

অধিক সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে ক্রিয়েটরের মস্তিষ্কে গভীর বিষণ্নতা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে নতুন কনটেন্ট তৈরির চাপ, জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতা ও নৈতিক সীমা অতিক্রমের প্রবণতা মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিয়মিত নতুন কন্টেন্ট আপলোড, ভিউ বাড়াতে নিয়মিত লাইভে আসা, ভাইরাল হওয়ার নেশায় নিম্নমানের কন্টেন্ট তৈরি কিংবা শেয়ার করা মনিটাইজেশন নেশায় পরিণত হয়েছে।

শুধুমাত্র তরুণ তরুণীরা নয় বরং দেশের শ্রমিক, দিনমজুর,কৃষক থেকে শুরু করে শিক্ষক, ডাক্তারসহ বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ছেন ফেসবুক মনিটাইজেশন নেশায়। নিজেদের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে নিয়মিত নিম্নমানের কন্টেন্ট তৈরি ও শেয়ার, লাইক, কমেন্টসের মাধ্যমে মেতে আছেন ভাইরাল হওয়ার যুদ্ধে।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৭১ লাখ বা ৬৭.১৮ মিলিয়ন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭.৫%। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের তরুণ প্রজন্ম দ্রুত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল লিটারেসি পর্যাপ্ত না থাকায় তারা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের কনটেন্ট নির্মাতারা ভিউ ও আয়ের মোহে পড়াশোনা, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক জীবনকে অবহেলা করছেন।

তারা ভাইরাল কনটেন্টের জন্য নিজস্ব স্বার্থ ও মান বিসর্জন দেওয়া, শিক্ষা ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, আত্মসম্মানবোধ ও নৈতিকতা লঙ্ঘন করে কনটেন্ট তৈরি করা, ক্রমাগত উদ্বেগ এবং নিস্তেজ মনে করতে থাকেন।

ফেসবুক মনিটাইজেশন তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। তবে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার অভাবে সেটি ব্যক্তিত্ব হারানো, মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটি কেবল আয়ের প্রতিযোগিতা নয়, বরং সৃজনশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক মূল্যবোধের ভারসাম্য রক্ষার সামাজিক প্লাটফর্ম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *