5169
Loading ...

বাংলাদেশে মাদক সমস্যা: জিরো টলারেন্স ও পুনর্বাসন দুই দিকেই নজর দেওয়া প্রয়োজন

শাহরিয়ার খান নাফিজঃ মাদক এখন কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও বটে। সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক পাচার রুটের নিকটতা এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তার কারণে দেশটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ট্রানজিট ও ভোক্তা বাজারে পরিণত হয়েছে।

মাদক মূলত দুইটি পথে দেশে প্রবেশ করে: দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের মাধ্যমে ইয়াবা, এবং উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তের মাধ্যমে ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক। এছাড়া সমুদ্রপথে বড় চালান কৌশলে আনা হয়। এই চক্রে বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জড়িত: সীমান্তবর্তী বাহক ও ছোট পরিবেশক, শহর ও জেলা পর্যায়ের আঞ্চলিক ডিলার ও সংগঠক, এবং আড়ালে থাকা বড় অর্থদাতা ও গডফাদাররা। কখনও কখনও প্রশাসনিক দুর্নীতি বা অবৈধ সন্ত্রাসী অর্থায়নও চক্রকে সক্রিয় রাখে।

সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রাষ্ট্রকে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

  1. আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগ করে বড় চক্র, অর্থদাতা ও আন্তর্জাতিক সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা।
  2. আর্থিক গোয়েন্দা নজরদারি: ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ও সন্দেহজনক বিনিয়োগ শনাক্ত ও বাজেয়াপ্ত করা। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা।
  3. সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার: স্ক্যানার, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করা।
  4. অবৈধ মাদক সেবনকেন্দ্র বন্ধ করা: ক্লাব বা ডিজে’র আড়ালে পরিচালিত অপরাধকেন্দ্র চিহ্নিত ও মালিক-পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা।

একই সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। আসক্তদের অপরাধী হিসেবে নয়, রোগী হিসেবে দেখা উচিত। মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং পরিবারকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পুনর্বাসনের পর দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ বা কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিলে পুনরায় আসক্তির ঝুঁকি থাকে।

জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজে মাদকবিরোধী শিক্ষা, পরিবারে নজরদারি ও মূল্যবোধ জোরদার করা, যুব সমাজকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত করা এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রশাসনের ভেতরে অসাধু প্রভাব থাকলে আইনও কার্যকর হবে না। তাই অভ্যন্তরীণ নজরদারি, স্বাধীন তদন্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে চায়, তবে কঠোরতা ও মানবিকতা—এই দুই নীতির সমন্বয় করতে হবে। বড় চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, আর আসক্ত নাগরিকদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—দুই দিকেই নজর দিলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব। সুস্থ যুবসমাজই শক্তিশালী জাতির ভিত্তি, এবং সেই ভিত্তি রক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একযোগে এগিয়ে আসতেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *