৫৫০ বছর ধরে ধ্যানমগ্ন এক মমি, কুড়াচ্ছে লাখো প্রণামী!



মানুষ মা’রা যাওয়ার পর মৃ’তদেহ মমি করে রাখার প্রচলন রয়েছে আদিকাল থেকেই। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মিশরে। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রাসায়নিকের মাধ্যমে মৃ’তদেহ মমি করা হত। মিশরের রাজা রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সে সময় মমি করে রাখার অনেক নিদর্শনই আম’রা পেয়েছি।

তবে মিশরেই যে শুধু মমি রয়েছে তা কিন্তু নয়। মিশরকে ছাড়িয়ে অনেক উন্নত দেশেই অনেক মমির সন্ধান মিলেছে। তবে উন্নত দেশ ছাড়াও ভা’রতে রয়েছে আশ্চর্যজনক এবং র’হস্যময় এক মমি। ভা’রতের হিমাচল প্রদেশের স্পিতি জে’লার গুয়ে নামের এক গ্রামে দেখা মিলবে এক মমির। তিব্বত সীমান্তের কাছে অচেনা এই গ্রামটি মমির জন্যই বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। সেখানে এই মমির নামে তৈরি করা হয়েছে একটি মন্দির।

প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছরের এই প্রাচীন মমিটি এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর। প্রাচীন তিব্বতি বৌদ্ধ লামাদের আরো মমি রয়েছে। লাদাখ, স্পিতি ছাড়াও কালিম্পং ও দেহরাদুনের বৌদ্ধ মঠে সংরক্ষিত আছে এসব মমি। অনুমান করা হয়, তিব্বত থেকে পালিয়ে ভা’রতে চলে এসেছিলেন তারা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় গুয়ে গ্রামে মাত্র ৫০ থেকে ৭৫ ঘর পরিবারের বাস।

এক হাজার বছরের প্রাচীন তাবো মনাস্ট্রি থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামের জনশ্রুতি। মানুষের মঙ্গল কামনায় স্বেচ্ছায় প্রা’ণ বিসর্জন দিয়েছিলেন এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। যাতে গ্রাম থেকে কাঁকড়া-বিছার উপদ্রব দূর হয়। পঞ্চদশ শতকের ওই সন্ন্যাসীর নাম সাঙ্ঘা তেনজিন। তার মৃ’ত্যুর পরে নাকি গ্রামে কাঁকড়া-বিছার উপদ্রব সত্যিই কমে গিয়েছিল।

ভাবছেন এত বছর পর কী’ভাবে আবিষ্কৃত হল এই মমি? তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অনেকের দাবি, সাতের দশকে ভূমিকম্পে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছিল এই মমি। তারপর তা আইটিবিপি উ’দ্ধার করে তুলে দেয় প্রশাসনের হাতে। আবার অনেকের দাবি, রাস্তা তৈরির সময় পাওয়া গিয়েছিল অর্ধ শতাব্দী প্রাচীন এই মমি। ১৯৭৫ সালে মমিটি উ’দ্ধার হয়। ধারণা করা হয় ৫০০ বছরেরও বেশি আগে মৃ’ত্যু হয়েছে এই সন্ন্যাসীর।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ধ্যানে মগ্ন থাকা অবস্থায় মৃ’ত্যু হয়েছিল সাঙ্ঘা তেনজিনের। পা মুড়ে বসা আর মুখটা ডান পায়ের হাঁটুর উপরে রাখা। মুখটা একটু খোলা। আর সেখানে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে মমির দাঁত। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো মমি সংরক্ষণ পদ্ধতিটি। সাধারণত কোনো মৃ’তদেহ মমি করে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয় নানা রাসায়নিক পদার্থ। তবে র’হস্যময় ব্যাপার হলেও সত্যি যে, মমিটি কোনো রকম রাসায়নিক ছাড়াই রয়েছে।

এমনকি পরবর্তীতে মিউজিয়মেও একাধিক কাঁচের স্তর দিয়ে ঢেকে এই মমি সংরক্ষণ করা হয়। তবে সাঙ্ঘা তেনজিন এখানে একটি সাধারণ কাঁচে ঘেরা বাক্সে র’হস্যময়ভাবে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থাতেই রয়েছে। উ’দ্ধার হওয়ার পরে তেমন কোনো পরিবর্তনই হয়নি মমিটির। জা’পানেও এমন অনেক মমি পাওয়া যায়। সেগুলোও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের।

গবেষকরা বলেন, বৌদ্ধ ধ’র্মাচারণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, সাধনার মাধ্যমে নিজের থেকে মমি হয়ে ওঠার পদ্ধতির কথা শোনা যায়। মনে করা হয়, সাঙ্ঘা তেনজিনও সেই পদ্ধতিতে নিজেই জীবিত অবস্থায় মমি হওয়ার সাধনা করেন। গবেষকদের বক্তব্য, বছরের পর বছর সাধারণ খাবার ত্যাগ করে নানা রকম ওষধি খেয়ে শরীরকে মেদ শূন্য করার পদ্ধতি নিতেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। আর তাতেই শরীরের পচন ও বি’কৃতি কম হয়েছে।

কার্বন ডেটিং বলছে, তিব্বতীয় এই লামা ধ্যানরত অবস্থায় মা’রা যান ১৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ মমিটি প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন। মমির হাতে এখনো জপমালা আছে। বৌদ্ধ বিশ্বা’স অনুযায়ী তিনি জোগচেন অনুশীলন করতেন। যা নাকি তাদের কাছে তপস্যার সর্বোচ্চ পথ। তাই তার কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত বেষ্টন করে আছে পবিত্র সুতা গোমথক। মিশরীয় মমির সঙ্গে তিব্বতীয় মমির অনেক পার্থক্য আছে। প্রাচীন মিশরে এমবাম বা রাসায়নিকের সাহায্যে ফারাও বা অন্য অ’ভিজাতদের ম’রদেহ সংরক্ষণ করা হত।

তিব্বতি সভ্যতায় মমিতে রাসায়নিকের ভূমিকা নেই। প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হত ম’রদেহ। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নিজেদেরকে মমি বানানোর প্রথাকে বলা হয় শোকুশিনবৎসু। মৃ’ত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই তারা এর প্রস্তুতি নেন। খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ প্রায় ছেড়েই দেন। এক জায়গায় ধ্যানে মগ্ন থাকেন।

বিশ্বা’স করা হয়, তিব্বতি লামা’রা ধ্যানের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় মৃ’ত্যুবরণ করতেন। কঠোর যোগের ভঙ্গিমায় বসে থাকার জন্য এবং দূষণহীন প্রাকৃতিক শীতলতায় থাকার জন্য দেহ সংরক্ষিত থেকেছে দীর্ঘকাল। বৌদ্ধ’রা বিশ্বা’স করেন, সাঙ্ঘা তেনজিন লামা এখনো মৃ’ত নন। তিনি এখনো রয়েছেন তপস্যারত।

গ্রামবাসীরা ভালবেসে তাকে ডাকেন মমি লামা। তাদের বিশ্বা’স সাঙ্ঘা ছিলেন বৌদ্ধদের গেলুগাপা শাখার সন্ন্যাসী। এখন সাঙ্ঘা তেনজিনের মমিটি কাঁচের বাক্সে ধ্যানরত অবস্থায় রয়েছে। পর্যট’করা আসেন তার মন্দিরে। আর সেই কাঁচের বাক্সেই জমা হয় বিভিন্ন অঙ্কের টাকার নোট। লাখো অর্থ জমা হয় সাঙ্ঘা তেনজিনের মমির সামনে। তাকে সম্মান জানাতেই দূর থেকে আসা মানুষেরা যে যার সাম’র্থ্য অনুযায়ী অর্থ প্রদান করে। প্রতিদিনই পর্যট’কদের ভিড় জমে গুয়ে গ্রামের মমি-মন্দিরে।