ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল হচ্ছে



নভেল করোনা ভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বিশ্বের দেশে দেশে চলছে লকডাউন। থমকে গেছে মানুষের জীবন-জীবিকা। ধসে পড়ছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি। দুর্ভিক্ষসহ কঠিন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে চলেছে বিশ্ব। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে ও মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে শিথিল করছে লকডাউন।

ইউরোপের দেশগুলোতে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ প্রথম থেকেই বেশি। সে কারণে ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে লকডাউনও চলছে বেশ আগে থেকে। তবে ধীরে ধীরে তারা লকডাউন শিথিল করছে। এরই মধ্যে ইতালি, স্পেন, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক লকডাউন শিথিল করেছে। এক মাসেরও বেশি সময় লকডাউন থাকার পর গত সপ্তাহে তা শিথিল করে স্পেন। একই সঙ্গে ইতালিতেও পাঁচ সপ্তাহ টানা লকডাউন থাকার পর গত সপ্তাহে শিথিল করা হয়েছে। এসব দেশের বিভিন্ন এলাকার দোকানপাট ও কলকারখানা ধীরে ধীরে খুলছে। শিথিল করা এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনও স্বাভাবিক হয়ে আসছে।

আগামী ৪ মে থেকে ইতালিতে লকডাউন আরও শিথিল করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। ইউরোপের অন্যতম দেশ জার্মানিও লকডাউন শিথিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ এপ্রিল থেকে দেশটির ৮০০ বর্গমিটার আয়তনের সব দোকানপাট খুলেছে। একই সঙ্গে গাড়ি, বইয়ের দোকান ও সাইকেলের দোকানও খুলেছে। এ ছাড়া গ্রিস ও দক্ষিণ কোরিয়ায় লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় লকডাউন শিথিলের পর সেখানে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে।

এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রকোপে মৃত্যুহারের শীর্ষস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে দেশটির সরকার লকডাউন করে রেখেছে গোটা দেশ। তবে এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন অনেক মার্কিন নাগরিক। তারা এই লকডাউন মানতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মার্কিন নাগরিকরা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। অনেক জায়গায় লকডাউন ভেঙেই মিছিল সমাবেশে হাজির হয়েছিলেন তারা। বিক্ষোভ সমাবেশকারীদের যুক্তি হলো, মার্কিন নাগরিকরা ঘরে থাকবেন কিনা সে সিদ্ধান্ত একান্তই তাদের। সরকার এভাবে ঘরে বন্দি করতে পারে না। এ ছাড়া এতে দেশের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়বে বলে যুক্তি দেখিয়েছেন তারা।

প্রতিবেশী দেশ ভারতেও লকডাউন চলছে। আগামী ৩ মে পর্যন্ত তা চলবে। তবে পরিস্থিতি শিথিল করার পরিকল্পনা চলছে। একই সঙ্গে লকডাউন শিথিলের পর কী কী বিধিনিষেধ থাকবে সেটা নিয়ে এখন থেকেই আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এ নিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। সেই বৈঠকে লকডাউন পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়েছে। ভারতে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি রাজ্যে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। দেশটির কেরালা, মহারাষ্ট্র ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন শিথিল হয়েছে।

মূলত যেসব এলাকায় করোনার প্রকোপ কমছে, সেসব এলাকায় লকডাউন শিথিল হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন রাজ্যে লকডাউন প্রত্যাহার করবে ভারত সরকার। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে শুধু লকডাউন কোনো কার্যকর সমাধান নয় বলেও মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ভারতের প্রখ্যাত মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. জয়প্রকাশ মুলিয়িল বলেছেন, করোনার বিরুদ্ধে লকডাউন কোনো সমাধান হতে পারে না। কেননা এটা একটি সাময়িক ব্যবস্থা। তিনি মনে করেন, করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে লকডাউন ঘোষণা না করলেও দেশে কার্যত লকডাউন চলছে। বিভিন্ন জেলা ও থানা আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ছুটি ঘোষণা ও দোকান-পাট-কল-কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। যেটা অন্য দেশের মতোই লকডাউন। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও লকডাউন শিথিল করা যায় কি না, তা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। কারণ দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে হলে, উৎপাদনমুখী কর্মকা অল্প মাত্রায় হলেও সচল রাখতে হবে। না হলে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে চলে যাবে দেশের আর্থিক খাত। খাদ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেখা দেবে চরম সংকট। এ কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে বিভিন্ন কলকারখানা ধীরে ধীরে খুলে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করেন আর্থিক খাতের অনেক বিশেষজ্ঞই।